আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়ছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকরা। বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর পাল্টাপাল্টি শুল্ক বৃদ্ধির পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতি ও মন্দার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মার্কিনদের কেনাকাটার ক্ষমতা ও আর্থিক আস্থায়। খবর সিএনবিসি।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুল্কারোপের ফলে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর কর বাড়ছে, যা বাড়িয়ে দিচ্ছে পণ্যের দাম। ফলে মূল্যস্ফতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যাতে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়ছে না মজুরি। ফলে মানুষ আর্থিকভাবে বেশি চাপের মধ্যে পড়ছে। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোক্তারা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভুগবে। ফলে কমে যাবে দৈনন্দিন ব্যয়, যা অর্থনীতিকে আরো ধীর করে দিতে পারে। এতে মন্দা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় আয় সম্পর্কিত আলোচনা এবং বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, খুচরা বিক্রেতা ও অন্যান্য ভোক্তামুখী ব্যবসাগুলোর লেনদেন বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বছরের বাকি সময়ের প্রবৃদ্ধি ওয়াল স্ট্রিটের ধারণার চেয়ে আরো কঠিন হবে বলে ইঙ্গিত করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পর্ষদ আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, আবহাওয়া ও "গতিশীল" সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ তাদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলেছে। তবে এর সঙ্গে বড় সমস্যা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত। প্রশাসন বাণিজ্য নীতিগুলোর ক্ষেত্রে যে দ্রুত পরিবর্তন এনেছে, তা বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। বাণিজ্য নীতির হঠাৎ পরিবর্তন ব্যবসায়িক পরিবেশে অস্থিতিশীলতা এবং ঝুঁকি তৈরি করে, যা ব্যবসাগুলোকে তাদের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
এভাবে খুচরা ও ভোক্তামুখী খাতে সংকট আরো তীব্র হয়েছে, যেখানে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য পরিবেশ পরিবর্তন হচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এক ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি চ্যালেঞ্জিং সময়। কারণ তারা এ অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজেদের বিক্রয় ও লাভ বৃদ্ধির পরিকল্পনা চালিয়ে যেতে চেষ্টা করছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরো অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে আকাশ পরিবহন খাতে ভোক্তা অংশগ্রহণ কমে যাওয়া। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষ বিদেশে ভ্রমণ বা ব্যবসায়িক সফর কমিয়ে দেয়, যা উড়োজাহাজ শিল্পের জন্য বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এটি একটি সংকেত হতে পারে যে গ্রাহকদের আয়ের ওপর চাপ বেড়েছে এবং তারা অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর দিকে ঝুঁকছেন।
মহামারীর পরে এ খাত, বিশেষ করে বৃহৎ আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। গ্রাহকরা বারবার প্রমাণ করেছেন যে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে বড় উল্লম্ফনের মুখেও তারা ভ্রমণ ছেড়ে দেবেন না। তবে এ সপ্তাহে ইউনাইটেড, আমেরিকান, ডেল্টা এবং সাউথওয়েস্টের মতো বৃহত্তম মার্কিন উড়োজাহাজ সংস্থার সিইওরা জানিয়েছেন, বছরের প্রথম প্রান্তিকে তারা চাহিদার মন্দা দেখতে পাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে আমেরিকান, ডেল্টা ও সাউথওয়েস্ট তাদের প্রথম ত্রৈমাসিকের পূর্বাভাস কমিয়েছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোর শক্তিশালী মার্কিন চাকরির বাজারে চাপের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, কারণ চাকরির বৃদ্ধি ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে।
এ প্রবণতাগুলো উত্তপ্ত শেয়ারবাজারে পানি ঢেলে দেয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছ, যা সম্ভাব্য মন্দা সম্পর্কে নতুন আশঙ্কা তৈরি করেছে। স্টক মার্কেট সূচক এসঅ্যান্ডপি-৫০০ সূচক ১০ শতাংশ পতন হয়েছে। যদিও শুক্রবার বিকালের মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে পুনরুদ্ধার হয়েছে।
ভোক্তাদের ব্যয়ের ওপর শুল্কের প্রভাব নিয়ে আরো চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বিনিয়োগকারী ও নির্বাহীরা। কয়েক মাস আগেও তাদের আশা ছিল যে প্রশাসন তাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে তা দুরাশায় পরিণত হয়েছে। এমনকি শক্তিশালী কোম্পানিগুলোও সতর্ক সুরে কথা বলছে। সোমবার সিএনবিসির "ক্লোজিং বেলে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেল্টা এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী এড বাস্তিয়ান বলেন, ‘ভোক্তাদের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং অবসর ও ব্যবসায়িক উভয় গ্রাহকই বুকিং থেকে সরে এসেছেন।’
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের আয়ের পূর্বাভাস কমিয়েছে আমেরিকান এয়ারলাইনস। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে তাদের একটি আঞ্চলিক জেটের সঙ্গে একটি আর্মি হেলিকপ্টারের মারাত্মক সংঘর্ষের পর বুকিং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি ভ্রমণ ও ঠিকাদারদের মতো সংশ্লিষ্ট ভ্রমণেও পিছিয়ে পড়েছে কোম্পানিটি। তবে ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার বিষয়ে এয়ারলাইনসের নির্বাহীরা আশাবাদী।
অন্যান্য শক্তিশালী কোম্পানি যেমন ডিকস স্পোর্টিং গুডস, এলএলএফ বিউটি ও অ্যাবারক্রম্বি অ্যান্ড ফিচ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় দুর্বল পূর্বাভাস জারি করেছে। যদিও বছরের দ্বিতীয়ার্ধের পূর্বাভাস নিয়ে তারা আশাবাদী। গত বছর থেকে ইউনাইটেড, ওয়ালমার্ট ও অ্যাবারক্রম্বির মতো কোম্পানিগুলো এসঅ্যান্ডপি-৫০০ ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা, এ বছরও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।